সম্প্রতি পাকিস্তান এবং সৌদি আরব একটি চুক্তি স্থাপন করে যার মধ্যে উল্লেখ ছিল যে যদি কোন দেশ পাকিস্তানকে আক্রমণ করে তাহলে সেটা সৌদি আরব তার নিজ দেশে আক্রমণ বলে ধরে নিবে এবং যদি কোন দেশ সৌদি আরবে আক্রমণ করে তাহলে পাকিস্তান তা নিজ দেশে আক্রমণ বলে গণ্য করবে।
এই চুক্তিটি অনেকটা ন্যাটো অন্তর্ভুক্ত দেশগুলো থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে করা হয়েছে বলে দাবি করছেন বিশিষ্ট বিশ্লেষকরা। তবে সে কথা অন্যদিকে রাখি। এই চুক্তিতে নতুন আরেকটি দেশের নাম নতুন করে যুক্ত হল পারমানবিক শক্তিধর পাকিস্তানের সাথে এই চুক্তিতে যোগ দিয়েছে ইউরোপের এবং এশিয়ার অন্যতম বড় রাজনৈতিক খেলোয়াড় তুরস্ক।
গত সপ্তাহে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ এবং সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এতে করে এই চুক্তিতে বর্তমানে ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী এবং ন্যাটোর অন্যতম প্রভাবশালী দেশ তুরস্ক যুক্ত হয়েছে। একদিকে যেমন সৌদি আরবের অর্থনীতি এবং পাকিস্তানের পারমাণবিক বোমা ঠিক তেমনি অন্যদিকে তুরস্কের রয়েছে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী এবং একটি শক্তিশালী অর্থনীতি।
এই চুক্তির কারণ?
সাম্প্রতিক সময় গুলোতে সারা বিশ্বেই রাজনৈতিক অবস্থা অস্থিতিশীল। গতবছর ভারত ও পাকিস্তান প্রায় একে অপরের সাথে যুদ্ধ শুরুই করে দিয়েছিল। ভারত পাকিস্তানের মধ্যে হামলা চালায় এবং পাকিস্তানও উল্টো ভারতে হামলা চালায় এবং উভয় পক্ষেরই অনেক সামরিক সদস্য নিহত হয়। এরপরই পাকিস্তান এবং ভারত উভয়ে নতুন মিত্র খোঁজার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মহলে ঘুরছে।
শক্তিশালী অর্থনীতির ভারতকে আটকাতে হলে শক্তিশালী অর্থনীতির বন্ধু রাষ্ট্র দরকার পাকিস্তানের তাই সৌদি আরবের সাথে এই চুক্তি স্থাপন করা হয়েছে। কেন না সৌদি আরবের বর্তমানে নিরাপত্তা দরকার যেহেতু মধ্যপ্রাচ্য একটি উত্তেজনাপূর্ণ অঞ্চল। যেহেতু পাকিস্তানের কাছে পারমাণবিক বোমা আছে তাই পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশই পাকিস্তানকে সমীহ করে চলে।
এর ফলে পাকিস্তানের অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব পড়বে কেন সৌদি আরব পাকিস্তান থেকে ব্যাপক পরিমাণ সামরিক সমরাস্ত্র ক্রয় করবে যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল পাকিস্তানের তৈরি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান। ধারণা করা হচ্ছে যে সৌদি আরব পাকিস্তান থেকে ৫০ টি যুদ্ধবিমান চার বিলিয়ন ডলার খরচ করে ক্রয় করতে যাচ্ছে।
অন্যদিকে তুরস্ক তার পার্শ্ববর্তী এবং মিত্র দেশগুলোর কাছ থেকে নিজের আস্থা আস্তে আস্তে হারিয়ে ফেলছে। তাছাড়াও বেশ কয়েকটি দেশ তুরস্কের প্রেসিডেন্ট কে অপহরণ এবং হত্যার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছে। যার ফলে তুরস্ক বুঝে গিয়েছে যে এরকম মিত্র দেশ দরকার যারা তার যুদ্ধকে নিজের যুদ্ধ বলে যুদ্ধ করবে। তাই দেশটি পাকিস্তানকে বেছে নিয়েছে। যেহেতু পাকিস্তানের কাছে পারমাণবিক বোমা আছে এবং একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনী আছে। তাই যুদ্ধের সময় তুরস্ক কে এটা অনেক বড় সহায়তা করবে।
এই জোটের সামরিক বাহিনী কি রকম?
এই জোটের সামরিক বাহিনী পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী সামরিক বাহিনী গুলোর একটি। এই জোটের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী রয়েছে তুরস্কের দখলে যাদের কাছে প্রায় ৮ লক্ষ সামরিক সেনা সদস্য রয়েছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান রয়েছে। তাছাড়াও দেশটি নিজ দেশেই শক্তিশালী ড্রোন এবং পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান তৈরি করছে। তাছাড়াও দেশটির হাতে রয়েছে পনেরশো কিলোমিটার দূরে নিখুঁত ভাবে আঘাত করতে পারা হাইপারসনিক ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। এর পাশাপাশি দেশটিতে রয়েছে নিজ দেশে তৈরি অ্যাটাক হেলিকপ্টার যা কিনা সারা বিশ্বের ব্যাপক নজর কেড়েছে।
এই জোটের দ্বিতীয় সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী হলো পাকিস্তানের। যদিও দেশটির হাতে পারমাণবিক বোমা রয়েছে তবে দুর্বল অর্থনীতির কারণে সামরিক শক্তি সেরকম বৃদ্ধি পাচ্ছে না। দেশটির সবচেয়ে শক্তিশালী বাহিনী হলো বিমান বাহিনী। এদের কাছে রয়েছে চীনের তৈরি পঞ্চম প্রজন্মের জে-৩৫এ যুদ্ধবিমান এবং ৪.৫ প্রজন্মের জে-১০সি (যা দিয়ে গত বছর ভারতের তিনটি রাফাল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করে পাকিস্তান)। এর পাশাপাশি রয়েছে নিজস্ব ভাবে তৈরি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান। তাছাড়াও দেশটির সামরিক বাহিনীকে ধরা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী এবং ভয়ংকর সামরিক বাহিনী হিসেবে। তবে দেশটির বিমানবাহিনী এবং সেনাবাহিনীর তুলনায় নৌবাহিনীর অবস্থা খুবই নাজুক।
এই তালিকার তৃতীয় শক্তিশালী তবে সামরিক সমরাস্ত্রের দিক দিয়ে সম্পূর্ণরূপে বিদেশের উপর নির্ভর করা দেশ হলো সৌদি আরব। দেশটির প্রতিবছর প্রায়ই ৮০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সামরিক বাহিনীর পিছে খরচ করে থাকে। দেশটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২০০ এর উপর এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ক্রয় করেছে এবং ৭০ টির বেশি ইউরো ফাইটার টাইফুন দেশটির বহরে রয়েছে। এর পাশাপাশি আমেরিকার তৈরি সবচেয়ে অত্যাধুনিক ট্যাংক বহর রয়েছে দেশটির কাছে। সম্প্রতি তুরস্ক থেকে ১০০ পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান এবং পাকিস্তান থেকে ৫০ টি যুদ্ধবিমান ক্রয়ের অর্ডার করেছে। যদিও এত শক্তিশালী এবং অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র থাকার পরও দেশটির বিমান বাহিনী এবং সেনাবাহিনী ইয়েমেনে তেমন কোনো সুবিধাই করতে পারেনি।
কতটা কার্যকর হবে এই জোট?
এই জোটের গুরুত্বপূর্ণ অপরিসীম কিন্তু প্রশ্ন হল এই জোট কি আদৌ ন্যাটো কিংবা অন্যান্য জোটের মত স্থায়ী হবে নাকি ওআইসির মতো একটি ব্যর্থ সংস্থা পরিণত হবে? কেননা পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ জোট হওয়া সত্ত্বেও ওআইসির ভূমিকা যেন সারা পৃথিবী জুড়ে নেই বললেই চলে। অথচ সারা বিশ্বে মুসলিম দেশগুলো বহিরশক্তি দ্বারা আক্রমণের শিকার হচ্ছে এবং অত্যাচারিত হচ্ছে।
তাহলে কি এই জোট স্থায়ী হবে নাকি আরেকটি ব্যর্থ সংস্থায় রূপান্তরিত হবে? যদি এই সংস্থাটিকে একটি সফল জোটের রূপান্তর করতে হয় তাহলে অবশ্যই অর্থনৈতিক দিক দিয়ে নিজেদের স্বাবলম্বী হতে হবে। অন্যথায় অন্য কোন দেশের সাথে বিরোধ সৃষ্টি হলে এবং অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম না হলে সেই দেশের নিষেধাজ্ঞা কিংবা অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে বাকি দেশগুলো একটি দেশের সাথে বেইমানি করতে পারে। যার ফলস্বরূপ এটি একটি ব্যর্থ জোটে পরিণত হবে।
আপাতত দৃষ্টিতে তুরস্ক এবং সৌদি আরবের কাছে খুবই শক্তিশালী অর্থনীতি রয়েছে তবে এর বেশিরভাগই তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের উপর নির্ভর করে রয়েছে। তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের বিকল্প খুঁজে বের করতে হবে এবং সেখানে প্রচুর পরিমাণ বিনিয়োগ করতে পারলেই একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক গড়ে তোলা যাবে। অন্যদিকে পাকিস্তানকে অবশ্যই নিজ দেশের মধ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা দূর করতে হবে এবং সামরিক বাহিনীকে দেশটির অর্থনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে দেওয়া যাবে না।
শুধু অর্থনৈতিক দিক দিয়ে উন্নতি করলে এই জোটের স্থায়িত্ব বেড়ে যাওয়া সম্ভাবনা অনেক কিন্তু এর পাশাপাশি সামরিক দিক দিয়ে নিজেদের স্বাবলম্বী হতে হবে। নিজ দেশে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান তৈরি করার মাধ্যমে নিজেদেরকে স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তুলছে তুরস্ক এবং পাকিস্তান। একই পথ অনুসরণ করতে হবে সৌদি আরব কে কারণ বেশিরভাগ সমরাস্ত্র এই দেশটি পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে আমদানি করে থাকে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে সবচেয়ে বেশি সামরিক আগ্রাসন পশ্চিমা দেশ গুলোই চালিয়ে থাকে। তাই সৌদি আরবকে অবশ্যই এই দেশ গুলো থেকে নিজেদের নির্ভরশীলতা কমাতে হবে।
শক্তিশালী অর্থনীতি এবং শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর সংমিশ্রণী সারা বিশ্বের তৈরি করতে পারে একটি দেশের আধিপত্য। যেমনটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো এত বছর ধরে করে আসছে। নতুন করে এর মধ্যে যুক্ত হয়েছে চীন যাদের অর্থনীতি বর্তমানে পৃথিবীর দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে এবং আগামী ৫০ বছরে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাপিয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হবে। চীনের মত একই পথে হাটছে এশিয়ার আরেকটি দেশ ভারত। দেশটি বর্তমানে পৃথিবীতে তৃতীয় বৃহৎ অর্থনীতির দেশে রূপান্তরিত হয়েছে এবং খুব তাড়াতাড়ি দেশটি সামরিক দিক দিয়ে নিজেকে স্বাবলম্বী করতে চায়। তাই ফ্রান্সের রাফায়েল যুদ্ধবিমান নিজ দেশে তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারতের বর্তমান সরকার।
